ল্যাপটপ ভালো রাখতে করণীয়
আজকাল ল্যাপটপ ছাড়া চলে না, অফিসের কাজ, পড়াশোনা, ফ্রিল্যান্সিং, বিনোদন, সবকিছুই এখন এই একটা যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন, একই মডেলের দুটো ল্যাপটপ কেনার তিন-চার বছর পর একটার পারফরম্যান্স আগের মতোই মসৃণ থাকে, আরেকটা ধীরে ধীরে ধীরগতির হয়ে পড়ে। পার্থক্যটা কোথায়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা নির্ভর করে ব্যবহারকারী কতটা যত্ন করে ল্যাপটপটা চালান, তার উপর।
এই আর্টিকেল এ এমন কিছু অভ্যাসের কথা বলব, যেগুলো মেনে চললে আপনার ল্যাপটপ দীর্ঘদিন ভালো থাকবে, পারফরম্যান্সও থাকবে ঠিকঠাক। কোনো জটিল টেকনিক্যাল বিষয় নয়, বরং দৈনন্দিন ব্যবহারে কাজে লাগে এমন কিছু সহজ পরামর্শই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ধুলাবালি থেকে বাঁচিয়ে রাখুন
আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ধুলাবালি একটা বড় সমস্যা। ল্যাপটপের ভেতরে ধুলা জমলে ফ্যান আর হিটসিংকের কাজ ঠিকমতো হয় না, ফলে ল্যাপটপ দ্রুত গরম হয়ে যায়। তাই ব্যবহারের সময় চেষ্টা করুন এমন জায়গায় রাখতে যেখানে ধুলা তুলনামূলক কম। মাসে অন্তত একবার নরম ব্রাশ বা ব্লোয়ার দিয়ে কীবোর্ড আর ভেন্টের আশপাশ হালকা করে পরিষ্কার করে নিন। আর বছরে একবার-দুবার সার্ভিসিং সেন্টার থেকে ভেতরের ফ্যান ও হিটসিংক পরিষ্কার করিয়ে নেওয়াও ভালো, বিশেষ করে ল্যাপটপ পুরনো হয়ে গেলে।
সমতল ও শক্ত জায়গায় ব্যবহার করুন
বিছানায় বসে বালিশের উপর ল্যাপটপ রেখে কাজ করার অভ্যাস অনেকেরই আছে। দেখতে আরামদায়ক মনে হলেও এটা ল্যাপটপের জন্য বেশ ক্ষতিকর। বালিশ বা কাঁথার মতো নরম জিনিসের উপর রাখলে নিচের ভেন্টগুলো বন্ধ হয়ে যায়, বাতাস চলাচল করতে পারে না, ফলে ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন চললে ব্যাটারি ও মাদারবোর্ডের উপর বাড়তি চাপ পড়ে।
চেষ্টা করুন টেবিল, ডেস্ক বা অন্য কোনো শক্ত সমতল জায়গায় ল্যাপটপ রাখতে। বাজেট কম থাকলেও একটা সাধারণ কুলিং প্যাড কিনে নিতে পারেন, এতে অনেকটাই স্বস্তি পাওয়া যায়।
চার্জিং অভ্যাসে সচেতন থাকুন
ব্যাটারি নিয়ে অনেকের মনে নানা ভুল ধারণা আছে। কিছু সহজ নিয়ম মানলে ব্যাটারির আয়ু অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব। ব্যাটারি একদম শূন্যে নামতে দেওয়া বা সবসময় ১০০ শতাংশ চার্জে রাখা — দুটোই ভালো না; চেষ্টা করুন চার্জ ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখতে। ননব্র্যান্ডেড বা লোকাল চার্জার ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ ভোল্টেজ ঠিক না থাকলে ব্যাটারি ও চার্জিং সার্কিটের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া চার্জে দিয়ে টানা অনেকক্ষণ ভারী কাজ, যেমন গেমিং বা ভিডিও এডিটিং করলে ল্যাপটপ বেশি গরম হয়, তাই এই সময়টায় একটু বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার।
সফটওয়্যার আপডেট রাখুন
শুধু হার্ডওয়্যারের যত্ন নিলেই হবে না, সফটওয়্যারের দিক থেকেও ল্যাপটপকে সুস্থ রাখতে হবে। অপারেটিং সিস্টেম আর অ্যান্টিভাইরাস নিয়মিত আপডেট রাখুন, এতে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা কম হবে। অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার বা ব্রাউজার এক্সটেনশন ইনস্টল করে রাখবেন না, কারণ এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে র্যাম আর প্রসেসরের উপর বাড়তি চাপ ফেলে। মাঝেমধ্যে অপ্রয়োজনীয় ফাইল আর টেম্পোরারি ডেটা ক্লিন করে নিন স্টোরেজ ফাঁকা থাকলে সিস্টেমও তুলনামূলক দ্রুত চলে।
যত্ন সহকারে বহন ও রক্ষণাবেক্ষণ
ল্যাপটপ বন্ধ না করে সাথে সাথে ব্যাগে ঢুকিয়ে হাঁটাচলা শুরু করবেন না; বন্ধ করার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর ব্যাগে রাখুন। একটা ভালো মানের ল্যাপটপ স্লিভ বা কেস ব্যবহার করুন, এতে হালকা ধাক্কা বা আঘাত থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। খাবার বা পানীয় ল্যাপটপের পাশে রেখে কাজ না করাই ভালো — একবার কীবোর্ডে পানি বা চা পড়লে অনেক সময় পুরো ল্যাপটপটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। স্ক্রিন পরিষ্কার করার সময় শুকনো নরম কাপড় বা মাইক্রোফাইবার কাপড় ব্যবহার করুন, সরাসরি স্ক্রিনে পানি বা স্প্রে দেবেন না।
দীর্ঘক্ষণ কাজ করলে মাঝে বিরতি দিন
একটানা ৪-৫ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ভারী কাজ, যেমন ভিডিও এডিটিং, রেন্ডারিং বা গেমিং করলে প্রসেসর আর ব্যাটারির উপর চাপ পড়তে থাকে। ঘণ্টা দুয়েক কাজ করার পর ৫-১০ মিনিটের একটা ছোট বিরতি নিন; চাইলে ল্যাপটপটাও একবার রিস্টার্ট দিয়ে নিতে পারেন। এতে সিস্টেম ঠান্ডা হওয়ার আর ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস ক্লিয়ার হওয়ার সুযোগ পায়।
থার্মাল পেস্টের কথাও মাথায় রাখুন
একটু টেকনিক্যাল বিষয়, তবে জানা থাকলে কাজে দেবে। প্রসেসর আর হিটসিংকের মাঝে থাকা থার্মাল পেস্ট সময়ের সাথে সাথে শুকিয়ে যায়, সাধারণত ২-৩ বছরের মধ্যে এর কার্যকারিতা কমে আসে। এটা শুকিয়ে গেলে তাপ ঠিকভাবে হিটসিংকে পৌঁছাতে পারে না, ফলে ল্যাপটপ আগের চেয়ে বেশি গরম হতে শুরু করে। পুরনো ল্যাপটপ হঠাৎ বেশি গরম হচ্ছে মনে হলে, অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে থার্মাল পেস্ট রিঅ্যাপ্লাই করিয়ে নেওয়া একটা ভালো সমাধান হতে পারে। নিজে থেকে খুলে এই কাজ না করাই ভালো ভুল হলে ওয়ারেন্টি নষ্ট হতে পারে বা হার্ডওয়্যারেরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ডেটা ব্যাকআপ ও নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করুন
গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও ডকুমেন্ট নিয়মিত ক্লাউড স্টোরেজে, যেমন Google Drive বা OneDrive-এ, অথবা এক্সটার্নাল হার্ডডিস্কে ব্যাকআপ রাখুন। পাশাপাশি একটা ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস বা নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করুন, এতে ডেটা নিরাপদ থাকবে। পুরনো HDD-যুক্ত ল্যাপটপ ব্যবহার করলে সুযোগ থাকলে SSD-তে আপগ্রেড করে নিন এতে শুধু গতিই বাড়বে না, হিটিং ইস্যুও কিছুটা কমে আসবে।
মাঝে মাঝে রিস্টার্ট দিন
অনেকেই ল্যাপটপ দিনের পর দিন স্লিপ মোডে রেখে দেন, কখনো পুরোপুরি বন্ধ করেন না। এতে ব্যাকগ্রাউন্ডে অনেক প্রসেস জমে থাকে আর সিস্টেম ধীরে ধীরে ধীরগতির হয়ে যায়। সপ্তাহে অন্তত একবার ল্যাপটপ সম্পূর্ণ শাটডাউন করে আবার চালু করুন, এতে সিস্টেম রিফ্রেশ হবে আর পারফরম্যান্সও ভালো থাকবে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ল্যাপটপ কতক্ষণ চার্জে রাখা উচিত?
সাধারণত ২০ থেকে ৮০ শতাংশ চার্জের মধ্যে রাখাই সবচেয়ে ভালো। পুরোপুরি ১০০ শতাংশ চার্জ করে দীর্ঘক্ষণ প্লাগইনে রেখে দেওয়া ব্যাটারির জন্য ভালো না।
ল্যাপটপ গরম হয়ে গেলে কী করব?
প্রথমে দেখুন ভেন্টগুলো বন্ধ হয়ে আছে কিনা। শক্ত সমতল জায়গায় রাখুন, ভারী কাজ চলাকালীন কুলিং প্যাড ব্যবহার করুন, আর দরকার হলে ভেতরের ধুলা পরিষ্কার করিয়ে নিন।
কত বছর পর পর ল্যাপটপ সার্ভিসিং করানো উচিত?
স্বাভাবিক ব্যবহারে বছরে একবার সার্ভিসিং করানো ভালো। যাদের কাজের চাপ বেশি বা ধুলাবালি বেশি এমন জায়গায় ব্যবহার হয়, তাদের ৬ মাস পরপর চেক করানো উচিত।
থার্মাল পেস্ট কতদিন পর পর বদলানো দরকার?
সাধারণত ২-৩ বছর পর পর থার্মাল পেস্ট শুকিয়ে যেতে শুরু করে। ল্যাপটপ হঠাৎ আগের চেয়ে বেশি গরম হচ্ছে মনে হলে, টেকনিশিয়ান দিয়ে থার্মাল পেস্ট চেক ও রিঅ্যাপ্লাই করিয়ে নেওয়া ভালো।
কোন অনলাইন শপ থেকে কিস্তিতে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ নেওয়া যাবে?
TechLand BD-এর নিজস্ব সরাসরি কিস্তি সুবিধা না থাকলেও, নির্দিষ্ট ব্যাংকের EMI কার্ডের মাধ্যমে এখান থেকে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ সহজেই কিস্তিতে কেনা যায়। কোন কোন ব্যাংক পার্টনার হিসেবে আছে, তা ওয়েবসাইটের EMI সেকশনে বিস্তারিত পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশে ভালো ল্যাপটপ সার্ভিস কোথায় পাওয়া যায়?
TechLand BD-এর মতো বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ল্যাপটপ সার্ভিস করানো যায়। এখানে অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সার্ভিস পাওয়া যায়।
Discussion
0Leave a Comment
No comments yet
Be the first to share your thoughts